1. smbipplob88@gmail.com : Masud Mukul : Masud Mukul
  2. newsbipplob2014@gmail.com : এস এম বিপ্লব ইসলাম : এস এম বিপ্লব ইসলাম
দ্রব্যমুল্য উর্ধগতি সৎ চাকুরীজিবীদের দীর্ঘশ্বাস
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ০২:৫৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

দ্রব্যমুল্য উর্ধগতি সৎ চাকুরীজিবীদের দীর্ঘশ্বাস

মো. আশরাফুল আলম
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৭ জুন, ২০২১
  • ৫৩ বার পঠিত

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে ব্যাগ নিয়ে বাজারে রওনা দিলাম। পথের মাঝে পাড়ার জব্বার মিয়ার দেখা। পাশের বাসাতেই থাকেন। দেখা হওয়ায় কথা বলতেই হঠাৎ রিকসা নিকটে এসে আমার ভাড়ার রিকসায় উঠে বসলেন। বল্লেন আপনি মনে হয় বাজারে যাচ্ছেন আমিও যাবো চলেন একসাথেই যাই। আমি আর কোন কথা বলার সুযোগ না পেয়ে শুধু বল্লাম চলেন। গাইবান্ধা জেলা শহরের পুরাতন বাজারে পৌছেই জব্বার মিয়ার ডাকে চায়ের দোকানে বসলাম। তিনি দুই খানা চায়ের হুকুম করলেন। চা আসার আগেই বাজার প্রসঙ্গে বল্লেন- ‘‘বউ লম্বা তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বল্লেন আজ মেহমান আসবে বাসায় যা বাজার করবে একটু বেশি বেশি করে নিয়ে এসো। কি আর করি রে ভাই বাজারে জিনিস পত্রের যে দাম। মাসিক সামান্য আয় দিয়ে যে আর কুলোতে পারিনা। কিভাবে কি করি আর মাথায় কাজ করছে না। এধরনের কথা এখন আমরা প্রায় লোকের মুখেই শুনি।

কারণ বর্তমান বাজারে দ্রব্য মুল্যের যে অনিয়ন্ত্রিত উর্ধগতি তাতে সৎ সাধারণ চাকুরিজীবি এবং দরিদ্র মানুষের পক্ষে স্বচ্ছলভাবে চলা সহজ বিষয় নয়। চা আসতে আসতে লম্বা তালিকা দেখে মনে জিজ্ঞাসার উদ্রেক হলো তাই বল্লাম-‘‘ এটা কি মাসকি বাজারের তালিকা? জব্বার মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লেন আরে ভাই কিসের মাসকি এটা আজকের জন্য। হয়তো আগামী সপ্তাহটা টেনেটুনে যাবে আর কি। মাসের প্রথম সপ্তাহ তাই লম্বা তালিকায় মাসকি বাজার করবার ইচ্ছে অনেকেরই হয়। প্রথম সপ্তাহে যখন এমন দীর্ঘশ^াস তবে বাকি দ্বিতীয় তৃতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহের কি হাল হবে এটা আর বলার প্রয়োজন হয় না। প্রসঙ্গক্রমে পাঠকের জানা দরকার হয়তো অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, দ্রব্যমুল্য উর্ধগতিতে শুধু চাকুরের কথা বলা হয়েছে কেন। দরিদ্র দিন মজুর অথবা সৎ ভাবে সাধারণ আয় উপার্জন ব্যক্তি/পরিবারে কথা নয় কেন। আসলে সমস্যা সকল সৎ উপার্জনকারীর জন্যই। উদাহরণ হিসেবে শুধু একজন চাকুরীজিবীর বহিঃপ্রকাশ বাক্যের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র। সেদিন জব্বার মিয়ার সাথে কথা না হলে হয়তো বিষয়টি এমনভাবে মাথায় সুরসুরি দিতো না।

আমার জানামতে জব্বার মিয়া একজন সৎ মানুষ। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছোট চাকুরী করেন। দুই মেয়ে এবং এক ছেলেসহ ৫ সদস্যের সংসার। স্ত্রী নাজমা বেগম গৃহিনী। ছেলে মেয়েদের লেখা-পড়া করবার জন্য গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন প্রায় ১৫ বছর। সন্তানরা লেখা পড়া করছেন ভলোই। তবে ছোট চাকুরী হওয়ায় বেতন সামান্য তাই সন্তানদের লেখা-পড়ার খরচ যোগাতে হিমসিম খেতে হয়। তবুও কোন রকমে কিছু চাহিদা অপূর্ণ রেখেই দিন পারি দিতে হচ্ছে। সৎ ভাবে চলেন তাই কোন বাড়তি আয়ের ধান্দা করেন না। চোখের সামনে সমপদে চাকুরি করে অনেকেই অসৎ উপায়ে রোজগার করে রাজার হালে চলছেন। বাজারের উর্ধগতি তাদের নিকট যেন কোন বিষয়ই নয়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলতে লাগেন- ‘‘মাসে বেতন পাই ২২ হাজার টাকা তার মধ্যে খরচ হয়, বাসাভাড়া-৫ হাজার, তিন ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ প্রায়-৮ হাজার, নিজের এবং স্ত্রীর ঔষধ প্রায়-২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার, ঋনের কিস্তি পরিশোধ হয় ২ হাজার, কাঁচা বাজার-৩ হাজার, মাছ মাংস-৪ হাজার। সর্বমোট খরচ ২৫ হাজার টাকা। টানাটানি করে চলেও মাসে দেনা ৩ হাজার টাকা। আর যদি পরিবারের কোন সদস্যর অসুস্থতা আসে তবে তা সম্পর্ণূ দেনা করেই চিকিৎসা করা ছাড়া কোন উপায় নেই।’’

ভাবুন তো এই পরিস্থিতিতে একজন চাকুরের যদি মাসিক বেতন ভাতা পাওয়ার পরও মাসে দেনা করে চলতে হয় তবে কোন অবস্থায় আছি আমরা। গত পনের বছরে বেতন যে হারে বেড়েছে দ্রব্যমুল্য তার চেয়েও বেড়েছে কয়েকগুণ লাগামহীন। মাসিক যে আয় তা দিয়ে যেন মাসের ২০-২২ দিন চলে। বাকি প্রায় ৮দিন চলে ধার দেনা করে। যে ধার দেনা পরিশোধ করতে বছরে একবার অফিসের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। এই অবস্থা শুধু একজন সৎ চাকুরি জীবির ক্ষেত্রে নয় সৎ সাধারণ এবং নি¤œ বিত্ত্যের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। সাম্প্রতি ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার চলতি বাজেট ঘোষনা হয়েছে জানিনা এর প্রভাবে কতটুকু উপকৃত হবে সৎ চাকুরিজীবি এবং দরিদ্র দিনমজুর মানুষ। সৎ চাকুরি আর সৎ উপার্জনকারীর কথা এই জন্যই বলা হচ্ছে যে, এই সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা অসৎ উপায়ে রোজগার করে সৎ মানুষের দর দাম করা মাছ মুরগীসহ অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য অধিক দাম হাকিয়ে ব্যাগে তুলে নিয়ে চলে যায়।

অসংখ্য জব্বার মিয়ারা শুধু মনের দীর্ঘশ^াস নিয়ে ব্যাগ হাতে বাজারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সস্তা দ্রব্য খুজে ফেরে। সমাজে অসৎ মানুষের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। তা না হলে দেশের আয় দিয়ে বিদেশে বাড়ী, তাও আবার একটা নয় একাধিক। এটা পরিস্কার যে একজন মানুষের জন্য কিন্তু কবর একটাই। একাধিক নয় অসৎ যারা একটু মনে রাখবেন। বর্তমান বাজারের লাগামহীন আর অনিয়ন্ত্রিত মুল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষও হতাশ। বাজারের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন এদেশে কোন সরকার নেই, কোন শাসন নেই, কোন অধিকার নেই, কোন সংবিধান নেই, নেই কোন প্রশাসন আর নেই কোন আইন। আমরা কি এখনও আদিম যুগের মতো শাসনহীন অবস্থায় জীবন যাপন করছি ? এক মাসের ব্যবধানে ১ লিটার সয়াবিন তেলে যদি মুল্য বাড়ে ২৫ টাকা তবে মণ প্রতি আর ব্যারল প্রতি কতো বৃদ্ধি পাচ্ছে তা হিসাব করলে সংজ্ঞাহীন হওয়ার মতো অবস্থা। ব্যয়ের সাথে আয়ের সামঞ্জস্যতা বজায় রাখা যুক্তিযুক্ত। মানুষ নুন্যতম উপায়ে বাঁচার জন্য প্রতি নিয়ত লড়াই করে। এই লড়াই করতে গিয়ে কেউ টাকার নেশায় আর কেউ কষ্ট নিবারনে অসৎ হয়ে যায়। কষ্ট নিবারনের জন্য যারা অসৎ হতে পারে তাদের নুন্যতম চাহিদা মিটিয়ে দিন পার করতে সহযোগিতা করা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের ভাবা উচিৎ।

নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের আয়ের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে চাল-ডাল, শাকসবজিসহ নিত্যপণ্য কিনতে। তাই সরকারি উদ্যোগে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরী ঠিক তেমনি সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কারখানায় কর্মরত সকল কর্মচারী এবং শ্রমিকের মজুরী/বেতন বৃদ্ধি করাটাও যুক্তিযুক্ত। শোনা যাচ্ছে আগামী জুলাই মাস থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা বিগত দিনের দ্বিগুন করা হবে। তবে দ্রব্যমূল্যের বিবেচনায় সাধারণ সৎ চাকুরিজীবিদেও ক্ষেত্রে বেতন ভাতা বৃদ্ধি নয় কেন। দ্রব্য মুল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কি ভুমিকা রাখছে? বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং এ সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান কি আছে ? অথবা থাকলেও কতটুকু তাদের দায়িত্ব পালন করছে সেটাও প্রশ্ন। আবার মনিটরিং টীমের কাজে মনিটরিং কে করছে এসব নিয়েও রয়েছে নানান প্রশ্ন।

যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় অথবা মূল্য বৃদ্ধি যৌক্তিক হয় তবে শ্রমিকের মজুরি এতো কম কেন। একজন চাকুরিজীবি কেন সারাদিন অশান্তি আর দুঃচিন্তা মাথায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। একজন সৎ কর্মচারী যেন পরিবারের নুণ্যতম চাহিদা পুরণ করে মানসিক প্রশান্তি নিয়ে সার্ভিস দিতে পারে সেই ব্যবস্থা তো তার কর্তা ব্যক্তিকেই করতে হবে। প্রজাকে কষ্টের মধ্যে রেখে রাজার রাজ্য পরিচালনা নিশ্চয়ই যথাযথ ন্যায্যতা নয়। তাই ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিয়ে যদি অবহেলা করা হয় সে দায়ভার কিন্তু রাজার উপরেই বর্তায়। উদাহরণ যাই হোক না কেন আজ জব্বার মিয়া হয়তো তার কথা গুলো বলেছে বলেই আমরা জেনেছি। এই দীর্ঘশ^াস শুধু একজন জব্বার মিয়ার নয়। এই দীর্ঘশ^াস আজ অনেক জব্বারের হৃদয়ে শব্দহীন কান্না হয়ে বাজছে। সুতরাং এই শব্দহীন কান্না অবসানে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া ঈমানী দয়িত্ব।

 

লেখক-

মো. আশরাফুল আলম

উন্নয়ন কর্মী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | গণ মানুষের খবর

Theme Customized BY LatestNews