1. admin3@gonomanuserkhobor.com : Admin3 :
  2. smbipplob88@gmail.com : Masud Mukul : Masud Mukul
  3. newsbipplob2014@gmail.com : এস এম বিপ্লব ইসলাম : এস এম বিপ্লব ইসলাম
শুক্রবার, ০৬ অগাস্ট ২০২১, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:

করোনায় আপন ঘরে পরবাস

মো. আশরাফুল আলম
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি অতিমারি হিসেবে রুপ নিয়ে সকল মানুষের কাছে এক আতংকের নাম হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। মানুষ এবং কোভিড-১৯ এর মধ্যে একধরনের যুদ্ধ চলছে। প্রায় একবছর পার হলেও করোনার থাবায় ক্ষতির পরিমান কমাতো দুরের কথা তা আরও নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে আক্রমনের থাবা অব্যাহত রেখেছে। ভ্যাকসিন দেয়াতে কিছুটা স্বস্থির নিঃশ্বাস দিলেও ভয় যেন দুর হচ্ছে না মানুষের মন থেকে। বিশ্বের ২১০টিরও বেশি দেশ এই অভিশপ্ত ভাইরাসের কাছে পরাজিত। লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েও যেন থামছে না করোনার ক্ষুধা।

গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কোন এক সময় চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে উৎপত্তি হয়ে বিশ্বে আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে এই ভাইরাস। অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন উপায়ে সামর্থ মোতাবেক নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে কিছু দিনের জন্য সংক্রমণ কমে আসলেও আবার কোথাও কোথাও মাথা চাড়া দিয়ে সামাজিকভাবে ভীতির সঞ্চার করছে। এখন পর্য়ন্ত অন্যান্য দেশের মতো ক্ষতি করতে না পারলেও যা হয়েছে তাও কম নয়। তবে যেমন এটি ভয়ংকর ঠিক তেমনি এটি নিয়ন্ত্রণও আমাদেরই হাতে। শুধু সতর্কতা এবং সচেতনতা আর কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলা। আমরা নিয়ম কানুন পালন না করে করোনা সংক্রমনের জন্য করোনাকেই দোষ দেই। যে ভাইরাস আক্রমণ করবে তাকে আর দোষ দিয়ে কোন লাভ হবে না। তার হাত থেকে নিজেদেরকে কিভাবে রক্ষা করবো তাই আমাদের ভাবাটা জরুরী।

করোনা মহামারীতে দেশের মানুষ নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এটি আমরা সবাই কমবেশি জানি। তবে এই ভাইরাসের আক্রমনের সাথে যোগ হয়েছে মানুষের অমানবিক আচরণ এবং ভ্রান্ত ধারনা। ভীতিকর কুসংস্কার এবং ঘৃনিত আচরণ। মানুষের রোগ হতেই পারে। মানুষের রোগ কিন্তু মানুষ দ্বারাই ভালো হতে পারে। কিন্তু সেই মানুষের মাঝে যদি একজন অসহায় মানুষ অন্যকোন ব্যক্তির কঠোর এবং অমানবিক আচরণ দ্বারা কষ্ট পায় তবে সে মরার আগেই মরতে পারে। পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেলে অনেক সময় আমরা দেখি যে, করোনা রোগীকে খাবার দেয়া হচ্ছে না, তাঁর ঘরবাড়ি লকডাউনের নামে একঘরে করা হচ্ছে, করোনা আক্রান্ত হলে ভাড়াকৃত বাসায় হঠাৎ করেই ওঠা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে,

বাড়ির মালিক কর্তৃক রুক্ষ আচরনের মাধ্যমে শাসন করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো করোনা রোগে কেউ মারা গেলে তার পরিবারের সাথে কেউ যোগাযোগ করছে না। মনে হচ্ছে করোনা হওয়া অর্থই সে যেন সমাজের নিকৃষ্ট মানুষে পরিণত হয়েছে। এমন আচরনের ফলে অনেকেই এখন আর এই রোগে আক্রান্ত হলেও কাউকে বলছে না। মনে হচ্ছে এই রোগটা হওয়া অর্থই যেন নির্ঘাত মৃত্যু আর সমাজ থেকে বিচ্ছেদ। এমন আচরণ মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি করা কতখানি সঠিক প্রশ্ন পাঠকের নিকট। তবে শুরুর দিকের ভীতিকর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে অবশ্যই সামান্য রুক্ষতাও থাকা উচিৎ নয় বলে আমি মনে করি।

কেউ করোনা আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা থাকতে হয় কারণ রোগের বিস্তর রোধে এই সতর্কতা টাও একধরনের চিকিৎসার পথ। রোগী ও পরিবারের সুস্থ্যতার কারনেই এমনটি করতে হয়। কিন্তু দেখা যায় একটি পরিবারের মধ্যে কোন একজনের করোনা পজিটিভ হলে তাদের প্রতিবেশীর নিকট সেই বাড়ির অন্যান্য সকল সদস্যই যেন ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন। আক্রান্ত পরিবারের কোন সদস্যকে দেখলেই কেমন যেন আচরণ দৃশ্যমান হয়। রফিকুল মিয়া বয়স ৪৫ বছর। করোনা পজিটিভ হলো। স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক বাড়ি লকডাউন করা হলো।

বাড়ি লকডাউন হলো কিন্তু বাড়িতে প্রায় ৮ জন মানুষ বাস করে। তাদের অফিস ব্যবসা সব বন্ধ। একজনের পরীক্ষায় পজিটিভ কিন্তু বাকি ৮ জনের পরীক্ষা না করেই বাড়ি লকডাউন দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন পাঠকের কাছে। জানা গেছে রফিকুল মিয়া সংক্রমিত হওয়ার সাথে সাথেই আলাদা ঘরে একাকী জীবন শুরু করে। তার পারও পুরো বাড়ির মানুষের চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি অমানবিক ছাড়া আর কি হতে পারে। করোনায় প্রায় ১৬ দিন বাড়ির মধ্যে থাকার পর ২য় দফা পরীক্ষার পর করোনা মুক্ত হওয়ার পর রফিকুল মিয়া মনে করে এবার পৃথিবীর আলোতে মুক্ত মনে ঘুরে বেড়াতে তার আর কোন বাঁধা রইলো না। কিন্তু করোনার আগের জীবনের সাথে রফিকুল করোনা আক্রান্ত হবার পরের জীবনের অভিজ্ঞতা মিলাতে গিয়ে মনের কষ্টে চাপা আর্তনাদে ভেঙ্গে পরেন।

তাঁর বাড়ি লকডাউন ঘোষনা করায় পাড়ার মানুষ জানে রফিকুল মিয়া করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। তাই করোনামুক্ত হবার পরও তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারিবারিক কারনে কথা বলতে অনিহার যেন শেষ নেই প্রতিবেশী এবং বন্ধু মহলের। পাড়ার চায়ের দোকানে গেলে চা বিক্রি করেন না, পাড়ার দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গেলেও অশোভন আচরণ করা, বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষের হাটা চলায় যেন ভীতিকর আর ঘৃনাভরা দুষ্টি দেখে সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাবার মতো। রফিকুল মিয়া তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেল্লেন- সব ঘটনা তুলতে না পারলেও দুই একটি ঘটনা তাঁর হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করেছে।

একজন পরিবারের কর্তা হয়ে যিনি সারাটা জীবন আয় উপর্জন করে পরিবারের ৫/৭ জন মানুষের ভরণ পোষন করে আসছেন। হঠাৎ করোনায় আক্রান্ত হবার পর তার জীবনের সকল অভিজ্ঞতাই উল্টাপাল্টা হয়ে যেতে লাগলো। আক্রান্তের ২য় দিন থেকে অজানা এক ভয় হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে লাগলো। দিনের বেলায় ঘরে শুয়ে বসে কেটে গেলেও প্রতিটি রাতের অন্ধকার যেন মৃত্যুকেই দেখতে লাগলো। পরিবারের আপন মানুষ গুলো মর্হুতেই হয়ে গেল পর। অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে ভাই বোন স্ত্রী সন্তান শুধু যেন একে অন্যের মধ্যে পাশকাটানো বুলি।

অসুস্থ মেয়ের পাশে বয়স্ক বাবা মা’র চোখে পানি, স্বামীর ভার মন শুধু অবাক তাকিয়ে দেখা। রাত গভীর হতে থাকে একাকিত্বের ভৌতিক মনে ভরকরে বসে। টিভির পর্দায় সংক্রমিতের মৃত্যুর খবর মনে আতংকের অন্ধকার ভারী করে তোলে। শুধু মনে হতে থাকে আজ রাতটাই বুঝি জীবনের শেষ রাত হবে। সঠিক কোন ঔষধ নেই যা আছে তা শুধু শান্তনা। পারিবারিক দুরত্বে থেকে ১৪ দিন কিংবা আরও বেশি সময় ধরে একা বদ্ধ ঘরে যেন আপন ঘরেই পরবাস। সকল সংশ্লিষ্টতাকে বিচ্ছিন্ন করে থাকা মৃত্যু ভয়ের একদম কাছাকাছি। একই সাথে নিজেকে বাঁচানো এবং পরিবারের অন্যান্যদের কে নিরাপদ রাখার লড়াই।

এমন প্রবণতার কারণে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক বা মানসিক চাপ কাজ করে। ফলে আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা এই মনোবৃত্তিতেই মারা যাচ্ছে অনেকেই। আবার এমন আচরনের ফলে অনেক মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয়ে হার্ট এ্যাটাক্ট হয়েও মৃত্যু বরণ করছেন। সকলের প্রতি অনুরোধ করোনা রোগীর সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সচেষ্ট থাকুন। আমাদের সকলেরই মনে রাখতে হবে নমুনা সংগ্রহ করলেও সেই ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত নাও হতে পারে। কারণ পরীক্ষা করা হয়েছে অনেকের সকলেই কিন্তু রোগী নয়। রোগী তারাই যাদের মেডিকেল থেকে চি‎হ্নিত করা হবে।

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিমে মানসিক সাহস দিয়ে কুসংস্কার এবং গুজবকে উড়িয়ে দিয়ে পাশে থাকার নাম মানবিকতা। সঠিক নিয়মে আগে থেকেই ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখা এবং বাজার ও কোলাহলপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলার মাধ্যমে এই সংকটময় সময়কে মোকাবেলা করতে হবে। পরিবারের প্রিয় মুখ এবং প্রতিবেশীদেরকে রক্ষা করতে সঠিক ধারনা নিয়ে সকলের প্রতি সত্যিকারের মানবিক আচরন করা খুবই জরুরী। প্রত্যেকটা মানুষেরই স্ব স্ব মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার রয়েছে। তাই আমাদের সকলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে সকলের বাঁচার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তবেই মিলতে পারে মানব মুক্তি ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | গণ মানুষের খবর

Theme Customized BY LatestNews